ককাটিয়েল পাখি পরিচিতি

ককাটিয়েল হল কাকাতুয়া পরিবারের একটি পাখি । এদের উৎপত্তি ও বিচরণ অস্ট্রেলিয়ায় । অস্ট্রেলিয়ার জলাভূমি, ঝোপঝাড় ও গুল্মভুমিগুলোতে এদের বসবাস করার স্থান । এদের শরীরের সবচেয়ে সুন্দর অংশটি হলো এদের ঝুঁটি । খাঁচায় পালন করা ককাটিয়েল সাধারণত ১৬ থেকে ২৫ বছর বাঁচে। সূত্র অনুযায়ী কিছু কিছু ক্ষেত্রে ককাটিয়েল ১০ থেকে ১৫ বছর বাঁচে। ককাটিয়েলের ৩২ বছর বেঁচে থাকারও ঘটনা আছে । একটি ককাটিয়েল পাখি অবশ্য ৩৬ বছর ও বেঁচে ছিল । এগুলো সাধারণত নির্ভর করে খাবার, পরিবেশ আর পরিচর্যার উপর ।

বিভিন্ন দেশের পাখি বিশেষজ্ঞরা ককাটিয়েলর মিউটেশন নিয়ে গবেষণা করে প্রায় ১৫ টিরও অধিক যার মধ্যে নরমাল গ্রে , লুটিনো , এলবিনো , হেভি পাইড , লাইট পাইড , পার্ল , সিনামন , পার্ল পাইড , ওয়াইট ফেস উৎপাদন করতে সক্ষম হয় ।

ককাটিয়েল পাখির খাবারঃ

ককাটিয়েল সীড মিক্স
ককাটিয়েল সীড মিক্স

প্রকৃতিতে এরা বিভিন্ন ধরণের খাবার খেয়ে থাকে। খাঁচায় সীডমিক্সের পাশাপাশি অঙ্কুরিত বীজ, বিভিন্ন রকমের ফল ও শাক-সবজি যেমন কলমি শাক, লাল শাক,পালং শাক, ধনিয়া পাতা, লেটুস পাতা, ব্রকোলি, শসা, গাজর, লেটুস পাতা, পেপে, শসা, মিস্টি কুমড়া ,অঙ্কুরিত বীজ, ইত্যাদি দেয়া যায়। সীডমিক্সে আমরা সাধারণত চীনা,কাউন, সূর্যমুখী ফুলের বীজ, তিশি, ধান, গুজিতিল, কুসুম ফুলের বীজ, কেনারি, মিলেট ইত্যাদি দিয়ে থাকি। ক্যালসিয়াম অন্যান্য মিনারেলের জন্য কাটেল ফিস বোন বা সমুদ্রের ফেনা জরুরি ।

মাঝে মাঝে অঙ্কুরিত বীজ ও সজনে পাতা দেয়া উচিত, এতে প্রচুর পরিমাণে প্রায় সবরকম ভিটামিন ও প্রোটিন আছে। ভেজানো ছোলা পাখির অনেক প্রিয় খাবার। ৫ – ৭ ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে ছোলা ছোকলা ফেলে খেতে দিতে পারেন। সপ্তাহে 5 দিন। এখান থেকে প্রোটিন পাবে পাখি। সাথে দেশি মুরগির ডিম্ বা কোয়েল পাখির ডিম্ সফ্ট ফুড হিসাবে দিতে পারেন।

ককাটিয়েল পাখির খাচাঃ

ককাটিয়েল পাখির খাঁচা
ককাটিয়েল পাখির খাঁচা

একজোড়া ককাটিয়েলের জন্য কম হলেও দৈর্ঘ্য ২৪ প্রস্থ ২৪ উচ্চতা ২৪ ইঞ্চি মাপের খাচা ব্যবহার করতে হবে। ইচ্ছে হলে আপনি আরও বড় মাপের খাচা ব্যাবহার করতে পারেন। দৈর্ঘ্য যত বেশি দেওয়া যায় তত ভাল, বেশি উড়াউড়ি করতে পারবে। বসার জন্য নিমের ডাল হলে ভাল হয়। খাচায় পাখির খেলাধুলার ব্যবস্থা করতে হবে। বাজারে ককাটিয়েলের জন্য বিভিন্ন খেলনা পাওয়া যায় আপনি প্রয়োজনে সেগুলো কিনে খাচায় রেখে দিতে পারেন। ইচ্ছে হলে নিজেও বানিয়ে নিতে পারেন।

ককাটিয়েল পাখির খাঁচা পরিষ্কারঃ

পাখির খাচার ট্রে প্রতিদিন না পারলেও অন্তত ২ দিন বা ৩ দিন পর পরিষ্কার করবেন। খাচার ট্রেতে সাদা কাগজ বিছালে ভালো হয়। যদি কখনো পাখির পূপ্স পরিবর্তন হয় তাহলে সহজে বুঝা যাবে। পাখির খাচা সপ্তাহে ১ দিন জীবাণুনাশক দিয়ে জীবাণু মুক্ত করবেন। নিমপাতা সিদ্ধ হালকা গরম পানি দিয়ে ফুল সেটআপ ধুয়ে কড়া রোদ এ ১ ঘন্টা দিয়ে রাখবেন । পাখিদের কোন ভাবে ভয় দেখানো যাবেনা। ছোট বাচ্চাদের পাখি থেকে দূরে রাখতে হবে।

প্রতিদিন একটা বড় বাটিতে গোসলের জন্য পানি দিতে হবে। নিজে থেকে না করলে স্প্রে করে দিতে হবে। গরমে বা ব্রীড করলে এলোভেরা মিক্স পানি দিলে ভালো । যারা ব্যবসায়িক উদ্দেশে পাখি পালেন তাদের একটি ব্যাপার মনে করিয়ে দিতে চাই যত বেশি আপনি পাখির জন্য করবেন তত বেশি লাভ পাবেন সুতরাং কিছু টাকা বাচাতে যেয়ে পাখিদের কষ্ট দিবেন না ভালো ফল পাবেন না।

ককাটিয়েল পাখির লিঙ্গ নির্ধারনঃ

ককাটিয়েল পাখির মেল- ফিমেল বুজতে কমবেশি সবাই দ্বিধা দ্বন্দে থাকি । কিছু ধারনা দেয়া হলো আপনাদের সুবিধার জন্য:

  • ছেলে ককাটিয়েলে সব সময় বেশি একটিভ এবং সুন্দর করে শিষ দেয়, কিন্ত মেয়ে তুলনামূলক চুপচাপ এবং মাঝে মাঝে হালকা ভাবে ডাক দেয় ।
  • গ্রে, লুটিনো, পার্ল, পাইড ইত্যাদি যেকোনো জাতের ককাটিয়েলের মেয়ে গুলোর ডানার নিচে ও লেজ এর ভিতরের পাশে হলুদ রঙের ফোটা ফোটা থাকে। কিন্ত ছেলে হলে এমন কোন ফোটা থাকে না, সিঙ্গেল কালার থাকে। তবে বেপারটা অবশ্যই পাখির বয়স ৬ মাস হওয়ার পর বুঝা যায় । কেননা বাচ্চা অবস্থায় ছেলে-মেয়ে উভয়ের শরীরেই ফোটা থাকে।
  • সাধারন গ্রে ককাটিয়েলের ক্ষেত্রে ডানা এবং লেজের ফোটা ছাড়াও আরেকটা উপায় আছে বুঝার উপায় সেটা হলো ছেলেদের মুখে হলুদ শেড মতো থাকে, কিন্ত মেয়েদের ক্ষেত্রে পুরোটাই গ্রে।
  • যেকোন পাখির ছেলে-মেয়ে শনাক্ত করার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি হলো পেলভিক বোন টেস্ট। পাখির ভেন্ট এ দুটি লম্বা হাড় থাকে যেটা তাদের পেলভিক বোন । মেয়ে পাখির হলে এই হাড় দুটির মধ্যে দিয়ে ডিম আসে বলে দুই হাড়ের মাঝে ফাক থাকে চাপ দিলে আঙ্গুল দিয়ে বুঝা যায় । আর ছেলে পাখির ক্ষেত্রে এই হাড় দুটির মাঝখানে কোন ফাক থাকে না। তাই আঙ্গুল দিয়ে এই ভেন্ট এরিয়া ধরলে সহজেই ছেলে-মেয়ে নির্ধারন করা সম্ভব। তবে এটি পাখির বয়স ৬ মাস হওয়ার পর করতে হবে।

ককাটিয়েল পাখির প্রজনন সক্ষমতাঃ

ককাটিয়েল পাখি প্রায় ৯ থেকে ১২ মাস বয়সে শারীরিকভাবে প্রজনন করতে সক্ষম হয় তবে পরিপক্কতা কেবল ১৫ থেকে ২৪ মাস বয়স হয়। তাই ১ বছর বয়সের আগে কখনোই ব্রিডে দেওয়া উচিত নয়। এই সময় তারা একটু এ্যাগ্রেসিভ বা হিংস্র মুড এ থাকে এবং মানুষ বা অন্য পাখি দেখলে খুব বিরক্ত হয়। তাই খুব প্রয়োজন ছাড়া খাচার আশেপাশে যাওয়া ঠিক না।

ব্রিডিং এর জন্য বক্স অবশ্যই দিতে হবে । এরা সাধারণত ৩ – ৪ টা আবার ৪ – ৮ তা সাদা রং এর ডিম পাড়ে। অনেক সময় বেশিও দেয় যেটা খুব কম দেখা যায়। ছেলে ও মেয়ে দুটাই ডিমে তা দেয়। ব্রিডিং সময় মেয়ে পাখি গন্ধ যুক্ত পূপ্স করে থাকে। বাচ্চা ফুটতে ১৮ থেকে ২৩ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। বাচ্চা ফোটার আগে থেকে নরম খাবার দিতে হবে এবং বাবা-মা ঠিকমতো খাওয়াচ্ছে কি না দেখতে হবে। ৪০-৪৫ দিনের মধ্যে বাচ্চা খাওয়া শিখে যায়।

ককাটিয়েল পাখি পোষ মানানোঃ

অনেকেই টেম বা পোষ করানোর জন্য কিছু না জেনেই ছোট বাচ্চা কিনছেন এবং ভুল খাবার , ভুল ওষুধ , নিজেদের মনমত পালন করতে গিয়ে মেরেও ফেলছেন। যার কারনে এখন মনে হয় এইসব বাচ্চা গুলো জন্ম নেই কিছু কিছু মানুষের হাতে মৃত্যুর জন্য। এক্ষেত্রে নতুন খাওয়া শিখেছে এমন বেবি কিনবেন। অনেকেরই হয়তো ভাবে বড় পাখি পোষ মানে না । এটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। এদের টেম বা পোষ মানানোর জন্য  শুধু প্রয়োজন একটু ভালোবাসা, একটু ধৈর্য আর পাখিটার সাথে একটু সময় দেয়া।

৮ মাস বয়সের ককাটিলও টেম করা যায় । পাখিটিকে যত বেশি সম্ভব সময় দেয়ার চেস্টা করবেন। কথা বলবেন। খেলাধুলা করবেন এভাবে যত সময় দিবেন ততই আপনাদের সম্পর্ক মজবুত হবে। আর কখনই পাখিটিকে ভয় দেখানো যাবে না, আঘাত করা যাবে না, পিছন থেকে ধরা যাবে না। হাতে নিতে চাইলে আপনার আঙ্গুল দিয়ে পাখির পেটের নিচে থেকে উপরের দিকে দিলে হাতে চলে আসবে। ককাটিয়েল সিঙ্গেল থাকতে ভয় পেয়ে থাকে। ওদের সাথে পার্টনার দিলে ওরা খুশি থাকে । আর পাখি যতই টেম হোক প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়া কখনো বাইরে নিয়ে যাবেন না । বাইরে হারিয়ে গেলে ওরা বাঁচে না।

ককাটিয়েল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেশি। খুব কম অসুস্থ হয় । ওদের খাঁচা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখলে, সীডমিক্স এবং অন্যান্য খাবার ধুয়ে খেতে দিলে এবং নিয়মিত ন্যাচারাল ওষুধ বা হোমিও কোর্স করলে সুস্থ রাখা আশা করা যায় । তবে চেষ্টা করবেন উল্টা পাল্টা ওষুধ না দিতে।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মুরগির BCRDV ভ্যাকসিন এর দাম কত এবং কিভাবে দিতে হয়

শিশুদের মানসিকভাবে তৈরি করুন

বাজরিগার ও ককাটিয়েল পাখির চোখের সমস্যার সমাধান