পাখি পালনে লক্ষ্য টাকা আয় - চটকদার বিজ্ঞাপন থেকে সাবধান

একটা জিনিস কিছুতেই আমার মাথায় আসেনা, কাউকে পাখি পালার প্রতি আগ্রহী করার জন্য “রপ্তানী সম্ভব”, “স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব”, “টাকা ইনকাম করা সম্ভব” এরকম বাক্যগুলো কেন ব্যবহার করা লাগে? পাখি কি তার ডাকাডাকি, আচার আচরণ, রঙিন পালক আর তার মেধা দিয়ে কম মুগ্ধতা ছড়ায় যে তাকে গ্রহণ করার জন্য কাউকে লোভ দেখানো লাগবে? বড় বড় ভিত্তিহীন স্বপ্ন দেখানো লাগবে? জোর করে পাখির প্রতি আগ্রহী করে লাভটা কি হচ্ছে? যে ব্যক্তি পাখি পছন্দ করে সে কি টাকা আয় না করতে পারলেও পাখি পুষবে না?

ঠিক আছে আমি মানলাম যে বেশি বেশি পাখি পালক সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এই বাক্যগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে, কিন্ত ফলাফল টা কি আসছে? কেউ যদি নিজের সর্বস্ব বেচে কিনে পাখির ব্যবসা শুরু করে অভিজ্ঞতা এবং ধারণার অভাবে সফল হতে না পেরে পথে বসে যায় তখন যারা এসব বড় বড় বাক্যগুলো বলে বেড়াচ্ছে তাদের কি খুঁজে পাওয়া যাবে?? আচ্ছা ধরে নিলাম সবাই সফল হল, সবাই ঝুড়ি ঝুড়ি বাচ্চা উৎপাদন করলো, কিন্ত এত পাখি যাবে কোথায়? রপ্তানীর ব্যাপারে অনেক আগে থেকেই অনেক কিছু শুনে আসছি কিন্ত আমার জানামতে এখনও কেউই সেটা করতে সফল হয়নাই এবং আমি যতদুর জানি ২০১৫ থেকে বাংলাদেশ থেকে পাখিসহ যেকোনো প্রাণী রপ্তানী সম্পুর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাহলে ফলাফল আসলে কি আসছে? ফলাফল একটাই, এবং সেটা বাজরিগার/জাভা/ডায়মন্ড ডাভের বর্তমান মার্কেট দেখলেই স্পষ্ট বোঝা যায়। ককাটিলের মার্কেটটাও ধীরে ধীরে শেষ হচ্ছে, কিছু মানুষ এখন লাভবার্ডের পিছেও লাগসে। অতিরিক্ত ব্রিডিং শুধু পাখির দাম কমানো ছাড়া আর কোনো উপকারে আসছে বলে আমি অন্তত মনে করিনা।

আমাদের এ্যাভিয়ান গাইডে আমি একটা লোকের গল্প শেয়ার করেছি যে আমাদের বাসার বেশ কাছেই থাকতো। বইয়ে সংক্ষেপে লিখেছি কিন্ত আজ বিস্তারিত বলবো, জানি অনেক বড় হবে তাও পড়ে দেখলে ঠকবেন না বরং এটা খুবই শীক্ষণীয়।

আনুমানিক ৪ বছর আগের কথা। তখন স্পাঞ্জেল বাজরিগার, জাভা এবং ডায়মন্ড ডাভের মার্কেট ছিল তুঙ্গে। তো যার গল্প বলছি তিনি ছোটখাটো একটা জব করতেন, পরিবার নিয়ে বেশ সুখেই ছিলেন। হঠাৎ একদিন পাখি পোষার শখ জাগলো এবং তিনি একজন ব্রিডার থেকে ২ জোড়া বাজরিগার কিনলেন, কিন্ত যেটা হয়, ঐ ব্রিডার অনেক গর্ব করে তাকে শুনিয়ে দিল আমি মাসে ৩০ হাজার টাকা ইনকাম করি পাখি থেকে। এই ডায়লগ আমাকেও অনেক আগেই শুনিয়েছিল কিন্ত আমার সাথে ছিলেন পাখি বিষয়ে চরম ভাবে অভিজ্ঞ আমার বাবা যিনি প্রায় ৪৫ বছর পাখির সাথে আছেন। বাসায় এসে তার কথাগুলো গুরুত্ব সহকারে শুনেই আমি বুঝলাম লোভে পড়লে কত্ত বড় ভুল করবো।

যাইহোক, ঐ নামকরা ব্রিডারের কথা শুনে এনার মোটামুটি মাথা নষ্ট হয়ে গেল। নিজের কিছু জমি আর শখের মটর সাইকেলটা বিক্রি করে দিলো, সাথে কিছু লোন নিয়ে প্রায় ৪ লাখ টাকা ইনভেস্ট করে শুরু করলো পাখি ওঠানো, ঠিক ঐ স্পাঞ্জেল বাজরিগার, জাভা এবং ডায়মন্ড ডাভ নিয়ে। প্রথমদিকে মোটামুটি ইনকাম খারাপ ছিল না, কোনো এক মাসে নাকি তার ৫০ হাজার ইনকাম হয়েছে বলেও দাবি করেছিল যদিও সত্যতা জানি। বাবার সাথে ডায়মন্ড ডাভ কিনতে গিয়ে শুনেছিলাম কথাটা, সাথে আরো কিছু হিসাব তিনি আমাদেরকে শুনিয়ে দিয়েছিলেন। এক জোড়া জাভা থেকে ৩ মাসের মধ্যে কিভাবে ১০ হাজার টাকা আয় করা যায়, একজোড়া ডাভ থেকে কিভাবে ২০ হাজার আয় করা যায় ইত্যাদি ইত্যাদি। তো আমরা শুনে একটু মাথা নেড়ে চলে আসলাম এবং তিনিও কন্টিনিউয়াসলি পাখি সংগ্রহ করতে থাকলেন, এক এক জোড়া সিলভার জাভা ৮-১০ হাজার করে, সাদা ডায়মন্ড ডাভ ১০-১৫ হাজার করে কিনে আনলেন বিভিন্ন জায়গা থেকে। ভাল কথা। বেশ ভাল ভেন্টিলেশন থাকায় সেবছর গরমকাল টা বেশ কেটে গেলো, কিন্ত শীত আসতে আসতেই শুরু হল মড়ক, শুরু হল ঐ তিন পাখির দাম মাটির সাথে মিশে যাওয়া। স্পাঞ্জেল বাজরিগার সাধারণের দাম বিক্রি হতে লাগলো যা তার কাছে প্রায় ২০০ জোড়া ছিল বাচ্চাসহ। জাভা এবং ডায়মন্ড ডাভ তখনও এতটা খারাপ পজিশনে আসেনাই তবে ১৫০০-২০০০ এ চলে আসছিল। এর মধ্যে আবার তার ডাক পড়লো সিলেটে, মাস দুয়েকের জন্য। সে যাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যেই অর্ধেক পাখি নাই। তার স্ত্রী তার কাছ থেকে নাম্বার নিয়ে আমাকে ফোন করে সব ঘটনা বললো এবং তার কান্নাকাটি শুনে তখনই ছুটে গেছিলাম তাদের বাসায়।

তখন দুপুর, তাদের ছোট্ট বাচ্চাটা শুকনো পাউরুটি খাচ্ছিল এবং মায়ের কাছে মাংসের আবদার করছিলো কিন্ত জানতে পারলাম বাসায় নাকি রান্নার মত চালও নাই। পাখি ঠান্ডায় যা মরেছে তার চেয়ে বেশি মরেছে খাবারের অভাবে এবং প্রচুর মারা যাওয়ায় ওখান থেকে কেউ পাখি কিনতেও রাজি হচ্ছেনা। পাওনাদারেরা এসে ভাঙচুর করার মত অবস্থা। ফলাফল ঐ পরিস্থিতি। আমি একদম হিতাহিত জ্ঞানশুন্য হয়ে পড়লাম, কি করব মাথায় আসছিলো না। এমন পরিস্থিতিতে আমার একজনের কথাই সবার আগে মাথায় আসে – আব্বু। তিনি তাদের কিছু আর্থিক সহযোগিতা করলেন আর আমি ছুটলাম অবশিষ্ট পাখিগুলো বাঁচাতে। বহু কষ্টে বাকি অর্ধেকের মধ্যে প্রায় ৮০% পাখি বাঁচাতে পেরেছিলাম। প্রতিদিন ৪-৫ ঘন্টা ওখানে থাকতে হত কারণ তখনও পাখি ছিল প্রচুর এবং নিজের পাখি বলে রেফারেন্স দিয়ে ১৫-২০ দিনের মধ্যে কোনোরকমে বহু কষ্টে প্রায় সব সেল করে দিয়েছিলাম। এবং আশ্চর্যের বিষয় হল এই পুরো ঘটনার মধ্যে যে মহামান্য ব্রিডার ৩০ হাজারের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন তাকে ফোন করে, বাড়ি গিয়েও পাওয়া যায়নি।

এটা শুধু আমার প্রত্যক্ষ করা কয়েকটি ঘটনার মধ্যে একটি। আপনার আশেপাশে খোজ করে দেখুন অহরহ ঘটছে এমন ঘটনা, লোভের কারণে শেষ হয়ে যাচ্ছে সবকিছু। আমি নিজেও হয়তো এই ফাদে পড়তাম কিন্ত বাবার কারণে বেচে গেছি, কারণ পাখি পুষে শখ মিটানোর পাশাপাশি মাসে ৩০ হাজার ইনকাম করা যাবে এটা একটা বিশাল ব্যাপার, মাথার মধ্যে ঐ মুহুর্তেই ম্যাকাও-কাকাতুয়া, দামী ল্যাপটপ, মোবাইল নাচানাচি শুরু করে দেয়। এজন্য বারবার বলি, কারোর মুখে এই কথাগুলো শুনে সাথে সাথে লাফানো শুরু করাটাই সবচেয়ে বড় ভুল। অনেক ব্রিডার আছে জাস্ট নিজেকে অনেক বড় কিছু জাহির করার জন্য এমন বড় বড় অঙ্কগুলো শোনায়, কিছু যদি সত্যি হয়ও, তাও তৎক্ষণাৎ তার স্থানে নিজেকে কল্পনা করা ঠিক না। তার অভিজ্ঞতা, তার সামর্থ্য, তার পাখি পোষার ধরণ, তার উৎপাদিত পাখির কাস্টোমার সব আপনার সাথে নাও মিলতে পারে, পাশাপাশি উপরে যেমন ঘটলো, আপনার কাছে ৮ হাজারে ডায়মন্ড ডাভ সেল দিয়ে বললো ৩ মাসে ১৬ হাজার আয় করবেন অথচ দেখা গেল ৩ মাস পর সে নিজেই ১ হাজার করে সেল করছে, এটাই বাস্তবতা।

যদি বর্তমানের কথা ধরেন, সান কনিউর ব্রিডিং পেয়ার কিছুদিন আগে ২০ হাজারে সেল হয়েছে, এখন সেটা লাখের কাছাকাছি, সামনে আবার ১০ হাজারে নেমে আসবেনা সেই গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে? রেইনবো বা জাপানিজ বাজেরিগারের মার্কেট এখন বেশ ভাল কিন্ত সারাজীবন এভাবেই থাকবে এমন গ্যারান্টি কেউ দিতে পারবে? কোনো জিনিসের চাহিদা ততক্ষণই থাকে যতক্ষণ সেটা হাতে পেতে কিছুটা হলেও বেগ পেতে হয়। বাজরিগারের মত ফুটপাতে, মুরগীর দোকানে, ফেরিওয়ালার ঝুড়ির মত মামুলী জায়গা গুলোতে চলে আসলে তার আর মূল্য বলে কিছু থাকেনা। হ্যা পাখি থেকে কম হোক, বেশি হোক অবশ্যই টাকা আয় করা সম্ভব কিন্ত সেটা করতে গেলে কিছু জিনিস আপনাকে অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে, কোনোমতেই পাখিকে আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে নেয়া যাবেনা, আপনার অবশ্যই আয়ের অন্য কোনো উৎস থাকতে হবে নাহলে উপরে বর্ণিত পরিবারের মত হাত পাতা বা পথে বসা লাগতে পারে।

আপনার নির্দিষ্ট কিছু ক্রেতা থাকতে হবে, যথেষ্ট পুঁজি থাকতে হবে, সেই সাথে যথেষ্ট অভিজ্ঞতা ও ধারণা যা শুধু কয়েকটা ফার্ম ভিজিট করে এবং ৩০ হাজারের ডায়লগ শুনেই অর্জন করা সম্ভব না। ইদানিং কারোর এ্যাভিয়ারি আর দেখতে যাইতে ইচ্ছা করেনা, কারণ গেলে ঐ একটা দৃশ্যই দেখা যাবে – সারিবদ্ধ একগাদা ছোট ছোট খাচা, সব কয়টার মধ্যে একজোড়া করে বাজরিগার। সারাদেশের মোট পাখি পালকদের অন্তত ৮০% এরই এ্যাভিয়ারির এই এক দশা।

একবার ভাবেন তো, যদি রপ্তানী করা সম্ভব না হয়, এত পাখি কোথায় যাবে? আমার তো মনে হয় একটা সময় আর ক্রেতা না পেয়ে আকাশে ছাড়া শুরু করতে হবে, তবে হ্যা, উপরক্ত বাক্যগুলো যারা ব্যবহার করছেন তাদের মধ্যে অনেকের উদ্দেশ্য ভালো, যেমন বলা যায় বেকারত্ব দূর করা যেটা বাংলাদেশের প্রধান একটি সমস্যা। কিন্ত বেকার সম্প্রদায় তো আর ফেসবুকে বসে কারোর পোস্ট দেখার অপেক্ষায় নেই তাইনা? তাদেরকে যদি স্বাবলম্বী করার ইচ্ছা থেকেই থাকে তাহলে তাদের আবাসস্থলে যান, পাখির জন্য যথোপযুক্ত ঘর বানিয়ে দেন, সঠিক সাইজের খাঁচা বানিয়ে দেন, পাখি বা আর্থিক সহায়তা দিয়ে সাহায্য করুন, যদি সেটা তারা এ্যাফোর্ড করতে পারে তাহলে প্রয়োজনীয় উপদেশ দিয়ে পাশে থাকুন।

স্বপ্ন যেহেতু আপনি দেখাচ্ছেন, কোনো কারণে হোচট খেলে ক্ষতিপূরণ টা কিন্ত আপনাকেই দেয়া লাগবে এটা মাথায় রাখবেন। ৩০ হাজারের বা স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়েই কেটে পড়বেন তা চলবেনা। আমি এখনও ভুলতে পারিনা সেদিন দুপুরের শুকনা পাউরুটি চাবাতে থাকা সেই পিচ্চিটার মলিন মুখ কিংবা তার মায়ের কান্নারত চেহারা এবং ঐদিনই মনে মনে শপথ করেছিলাম যেমনভাবে আমার বাবা আমাকে বুঝিয়েছে তেমনভাবে আমিও কাউকে এই ভুল পথে যেতে দেবনা। যদিও কিছু বড় বড় মানুষের ঐ ৩০ হাজারের গল্পের কাছে আমার অনুরোধ ফিকে হয়ে যায় অনেক সময়, তারপরও আমি চেষ্টার কমতি রাখিনা কারণ পাখির কারণে কেউ পথে বসুক বা পাখি নিজেই পথে নেমে আসুক দুটোর একটাও আমি চাইনা। আশা করি আপনারও সেটা চাইবেন না।

অনেক কথা বলে ফেললাম, কষ্ট করে পড়ার জন্য ধন্যবাদ।


প্রকৃত লেখক Shanjid Islam Sharod

সংশোধন এবং যোজন ও বিয়োজন করেছেন Emdad Khan

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মুরগির BCRDV ভ্যাকসিন এর দাম কত এবং কিভাবে দিতে হয়

শিশুদের মানসিকভাবে তৈরি করুন

বাজরিগার ও ককাটিয়েল পাখির চোখের সমস্যার সমাধান